করোনা মহামারিতে মসজিদে সালাত আদায়ে ইসলামী নির্দেশনা


মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ

ইসলামে ছোঁয়াচে রোগ ও রোগী থেকে দূরে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংক্রমণের ফলে সৃষ্ট রোগকে সংক্রামক রোগ বা ছোঁয়াচে রোগ বলে। সংক্রমণ বলতে কোন পোষক জীবের দেহকোষে রোগ সৃষ্টিকারী সংঘটকের অনুপ্রবেশ, আক্রমণ, সংখ্যাবৃদ্ধি, পোষকের দেহকলার সাথে সংঘটিত বিক্রিয়া এবং এর ফলে উৎপন্ন বিষক্রিয়াকে বোঝায়। ইসলামে সাধারণত রোগীদের সেবা প্রদান, দেখতে যাওয়া, খোজ-খবর নেওয়া ও আরোগ্য লাভের জন্য দোয়া প্রদানের বিষয় মহানবী (সা.) এর হাদীসে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।

একজন মুসলিমের উপর অপর মুসলিমের ৬টি অধিকারের একটি হলো রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া। এটি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি সামাজিক বিধান। ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) এর মতে, রোগীকে দেখতে যাওয়া ওয়াজিব। উক্ত হাদীসে রোগীর প্রতিশব্দ আরবীতে ‘মারি- জ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ অসুস্থ বা রোগী। যাদের দেখতে যাওয়া, খবর নেওয়া ও সহযোগিতা করার নির্দেশ প্রতিবেশী বা সকল মুসলিমের হক্ব হিসেবে বিভিন্ন হাদীসে বৈচিত্রতা সহকারে বর্ণিত হয়েছে ঐ জাতীয় সাধারণ রোগী হলো ‘মারি-জ’। আর ছোঁয়াচে রোগীর বর্ণনার হাদীসে রোগীর প্রতিশব্দ হিসেবে ‘মুমারিরজ’ শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ নিজে অসুস্থ বা রোগী; অন্যকেউ রোগী বানায়। ছোঁয়াচে রোগীর ব্যাপারে ইবনে হুযায়মা হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেন- রাসূল সা. বলেছেন-, ‘তোমরা ছোঁয়াচে রোগী থেকে এমন ভাবে পলায়ন করো; যেমনিভাবে বাঘ দেখলে পলায়ন করো। এখানে পালাতে বলেছেন, দূরে থাকতে বলেন নি।

বিষয়টি গভীরভাবে ভাবলে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে এ ধরনের ছোঁয়াচে রোগী থেকে দূরে থাকতে হবে, সঙ্গ পরিত্যাগ করতে হবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকেও হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে ভিন্ন ভাবে বিকল্প বর্ণনায়, তাহলো- নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘কুষ্ঠরোগি থেকে পলায়ন করো, যেভাবে তোমরা সিংহ থেকে পলায়ন কর। (বোখারী: ৬০৮) আরো বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমরা ছোঁয়াচে রোগীর কাছে সুস্থ লোককে নেবে না। (বোখারী: ৬৭৭১) কেউ কেউ বলবেন, রাসূল সা. কোষ্ঠরোগীর সাথে একই প্লেটে খেয়েছেন এ হাদীসও তো আছে। হ্যাঁ, আছে বটে তবে আসলে ঐ হাদীসটির প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ রূপে ভিন্ন ছিলো। বরং ছোঁয়াচে রোগ থেকে বাঁচার জন্য এবং গুরুত্বের সাথে সতর্কতা অবলম্বনের কথা অনেক হাদীসে বিভিন্ন ভাবে বলা হয়েছে। যার মাধ্যমে সতর্কতা অবলম্বনের ব্যাপারটি গুরুত্ব পেয়েছে।

যেমন ছোঁয়াচে রোগ প্রসঙ্গে আবুবকরের (রা.) এর উপস্থিতিতে হারিছ (রা.) ও আবু হুরায়রা (রা.) এর কথোপকথনেই তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত রয়েছে। আর তা ছাড়া হাদীসে ভিন্ন ভাবে ছোঁয়াচে রোগীর সংস্পর্শে না আসতে এমনকি তার দিকে না তাকাতেও বলা হয়েছে। নবীজি (সা.) বলেছেন- ‘ছোঁয়াচে রোগীর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকো না।’ শুধু তাই নয়, রাসূল (সা.) কোনো জনপদে মহামারি দেখা দিলে সেখানে প্রবেশ ও বাহির হওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন; যাকে আমরা আজ কোয়ারান্টাইন বলে থাকি। রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ যদি ভাইরাস বা এ ধরনের কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়, তাহলে সে যেন কোনো সুস্থ ব্যক্তিকে আক্রান্ত না করে। কোনো এলাকায় যদি প্লেগ বা এ ধরনের সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ে, সেখানে যেও না এবং সেখান থেকে কাউকে বের হতে দিবে না।

(বোখারী: ৫৭৩৯) তাই যখন সংক্রামক কোনো রোগ ছড়িয়ে পড়ে, তখন আমাদেরকে অবশ্যই সতর্ক থাকা দরকার। আমরা যাতে অন্য কাউকে সংক্রমিত না করি। আর আমরা সংক্রমিত কি না, এখনো জানি না, ফলে অন্যদের মাঝে যাতে সংক্রমণ না ঘটে অথবা অন্যদের মাধ্যমে যাতে আমরা সংক্রমিত না হই, সে প্রচেষ্টা ও সচেতসতা আমাদের গ্রহণ করা দরকার। তাই এ জন্য করোনাভাইরাসের এ প্রদুর্ভাবে মসজিদে না গিয়ে বরং নিজ নিজ বাসায় সালাত আদায় করাই অধিক যুক্তিযুক্ত ও ইসলাম সম্মত। যারা ‘ইসলামে ছোঁয়াচে রোগ নেই’ মর্মে হাদীসের উদ্বৃতি দেন তারা হাদীসের সঠিক মর্মার্থ না বুঝে অর্থগত বর্ণনা দেন মাত্র। কোরআন ও হাদীসের আক্ষরিক অর্থ দিয়ে অনেক সময় সঠিক বিষয়টাকে বুঝা যায় না। মূলত হাদীসটির মূল আরবী পাঠ এর সঠিক তরজমা হলো, ‘রোগ-ব্যধি (তার নিজস্ব ক্ষমতায়) একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে লেগে যায় না।

(সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৫৭৪২) ‘ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই’ -হাদিসের এ তরজমা বিশুদ্ধ নয়। কেননা, এর থেকে বোঝা যায়, বাস্তব ছোঁয়াচে রোগকে ইসলাম অস্বীকার করেছে। অথচ রোগাক্রান্ত হওয়ার অন্যান্য কারণ যেমনিভাবে বাস্তব; তদ্ধসঢ়;রূপ রোগাক্রান্ত হওয়ার এই কারণটিও বাস্তব। ইসলাম একে অস্বীকার করেনি। এক্ষেত্রে যে বিষয়টিকে ভ্রান্ত ও বাতিল সাব্যস্ত করা হয়েছে তা হলো, কোনো ব্যাধিকে এমন মনে করা যে, তা নিজে নিজেই সংক্রমিত হয়। যেমনটি জাহেলী যুগে মনে করা হতো। উপকার ও অপকারের একমাত্র মালিক আল্লাহ তাআলা। হায়াত-মওত, সুস্থতা-অসুস্থতা সবই তাঁর হুকুমে হয় থাকে। মোটকথা, অন্য সময়ে মসজিদে লোক পাওয়া যায় না, কিন্তু করোনা ভাইরাসের মধ্যে আমরা অনেকেই আবেগ দেখাচ্ছি।

এটা কিন্তু আবেগের বিষয় না, এটা এখন বাস্তবতা। কারণ বাধ্য হয়ে জীবন ধারনের জন্য আমাদের অনেক সময় হারাম খাদ্য খাওয়ার অনুমতি ইসলাম দিয়েছে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি যদি এতোটাই ক্ষুধার্ত থাকে, তবে তাকে হারাম খেলে দোষারোপ করা যাবে না। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘তবে যে কেউ অবাধ্য না হয়ে এবং সীমালংঘন না করে নিরুপায় হয়ে তা গ্রহণে বাধ্য হয়েছে, তবে নিশ্চয় আপনার রব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (৬:১৪৫) অথচ তখনো এমন কিছু আলেম থাকবেন, যারা বলবেন- মরে গেলে যাও, তারপরও হারাম খাওয়া যাবে না। এখন যেমন কিছু লোক বলেন, বেশী লোক নিয়ে মসজিদে যাও; আল্লাহ ভাগ্যে লেখে রাখলে মৃতে্যু আসবেই। এটাই যদি হয় তাহলে আমরা আমাদের বাচ্চাদের ছুরি দিয়ে খেলতে দেইনা কেন? আল্লাহ যদি লেখে রাখে তাহলে সে মারা যাবে, না হয় সে মারা যাবে না। কিন্তু আমরাতো তা করিনা বরং ছুরিটি সরিয়ে ফেলি, বাচ্চাদের থেকে দূরে রাখি। রাসূল (সা.) উট বেঁধে তাওয়াক্বুল করতে বলেছেন, উট ছেড়ে দিয়ে নয়।

বিষয়টা বুঝতে হবে সকলের। তাই বাস্তব কথা হলো, এই মুহূর্তে লোক সমাগম এড়িয়ে চলাই ইসলামের নির্দেশ ও বিধান। ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, ইবনে হাজর আসকালানী (র) মহামারি সম্পর্কে তার অনবদ্য গ্রন্থ ‘বজলুল মাউন ফি ফাজলিত তাউন’ -এ দুটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। দামেস্কে একবার মহামারি ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন তারা হাজারো মানুষ সমবেত হয়ে ভাইরাস থেকে রক্ষার জন্য দোয়া করেছিলেন। আগে প্রতিদিন ৫০ জন করে মারা যেত, দোয়া মাহফিলের পর হাজার মানুষ মারা যেতে লাগল।

অনুরূপ, কায়রোতে ৮৩৩ হি. সনে ব্যাপক মহামারি সৃষ্টি হয়েছিল। সকলে তিন দিন রোযা রেখে মরুভূমিতে গিয়ে দোয়া করল। জমায়েতের ফল হল হিতে বিপরীত। মৃত্যুর সংখ্যা এক লাফে বেড়ে গেল দৈনিক হাজারে। দোয়া মাহফিল ভালো নি:সন্দেহে। কিন্তু মহামারির সময় ঘরে অবস্থান করা ইসলামের নির্দেশ; এই নির্দেশ পালন করাই শরিয়াত। আর এ কারণে ভয়াবহ আমওয়াস মহামারির সময় আমর বিন আস (রা) বললেন- ‘হে লোকসকল, এ মহামারি হল আগুনের মত। যখন আসে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কাজেই তোমরা পাহাড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়।’ তখন সকলে পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। তাই আমাদের প্রত্যেককে এখন ঘরমুখী হতে হবে এবং ঘরকে মসজিদে রূপান্তর করতে হবে। বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা এ রোগ প্রতিরোধ এবং প্রতিষেধক নিয়ে মানুষকে
দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। তারা বলছেন এটি অবশ্যই একটি ছোঁয়াছে ও সংক্রামক ব্যাধি।

কাজেই সব ধরনের সমাগম পরিহার করে চলতে হবে। কোনো কোনো আরব দেশে মসজিদে নামাজের জামাত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জুমা বন্ধ হয়েছে আরবের বাইরের দেশেও। সালাতুল জুমুআর ব্যাপারে হাদীস হলো- লোকেরা যেনো সালাতুল জুমুআ ছেড়ে দেওয়া থেকে অবশ্যই বিরত থাকে, নয়তো আল্লাহ অবশ্যই তাদের অন্তরে সিল মেরে দেবেন। তারপর তারা উদাসীনদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাবে।’ (মুসলিম- ৮৬৫; নাসঈ-১৩৭০) আর পবিত্র আলকুরআনে নামাজ কায়েমের কথা বলা হয়েছে। আর সে জন্যই মসজিদে গিয়ে জামাত বা সংঘবদ্ধভাবে একত্রে নামাজ আদায় করতে হয়। তবে ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ীই কিছু শর্তসাপেক্ষে মসজিদে না গিয়েও ঘরে নামাজ আদায় করার অবকাশ রয়েছে। আমাদের দেশে কিছু কিছু অবিদ্যান ব্যক্তি বলে বেড়াচ্ছেন, আল্লাহর গজব থেকে বাঁচতে বেশি বেশি মসজিদে আসতে হবে।

অথচ বৃষ্টির জন্যও তো নবীজি (সা.) মসজিদে না এসে ঘরে নামাজ পড়ার কথা বলেছেন। বেলাল আজানের সময় ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন ‘সাল্লু ফি রিহালিকুম’ অর্থাৎ ‘যার যার ঘরে নামাজ পড়ে নিন’। তাহলে এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কেন মসজিদে না এসে থাকা যাবে না? মালয়েশিয়ার ৬০ শতাংশ রোগী করোনা আক্রান্ত হয়েছেন মসজিদ থেকে, তাবলিগী ইজতেমা থেকে। ইরানে করোনা শুরু হয় কোম শহর থেকে, যেখানে একটি মাজার রয়েছে। যার সংক্রমণ ইরাক, লেবানন, কুয়েত, বাহরাইনসহ বেশ কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। দিল্লির মারকাজ নিজামুদ্দিনে তাবলিগের সমাবেশে অন্তত ৯ হাজার মানুষ অংশ নেয়াদের মাধ্যমে দেশটিতে অন্তত ৪০০ জন করোনা সংক্রমিত হয়েছেন। দেশটির কর্মকর্তাদের ধারণা, এতে অংশ নেন; যাদের অনেকেই বিদেশি। তাবলিগ জামাতে অংশগ্রহণকারীদের সবাই করোনার ঝুঁকিতে আছেন বলে জানিয়েছেন তারা।

দিল্লি পুলিশের একাধিক সূত্র দেশটির সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে জানিয়েছে, ৫৬ বছর বয়সী মাওলানা সাদ আইসোলেশনে আছেন সম্ভবত করোনা সংক্রমিত হওয়ার কারনে। মাওলানা সাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে পুলিশ বলছে, তিনি সামাজিক দূরত্ব ও বড় ধরনের জনসমাগম বাতিলে সরকারের দেয়া নির্দেশনা উপেক্ষা করে ভক্তদের সমবেত হতে উৎসাহ দিয়েছেন। মারকাজ নিজামুদ্দিন ভবন খালি করতে পুলিশ দফায় দফায় নোটিশ পাঠালেও তিনি তাতে কর্ণপাত করেননি। গত বুধবার মাওলানা সাদের এক অডিও বার্তাটিতে তিনি বলেন, মৃত্যুর  জন্য মসজিদই সর্বোত্তম জায়গা। করোনাভাইরাস তার ভক্তদের কোনও ক্ষতি করতে পারবে না বলেও অডিওতে তাকে জোর দিয়ে বলতে শোনা যায়। গত ২৩ মার্চ এক বক্তৃতায় সামাজিক দূরত্বের সতর্কতাকে মুসলমানদের একে অপরের কাছ থেকে দূরে রাখার ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করেন মাওলানা সাদ।

তিনি বলেন, আপনি মৃত্যু থেকে কোথায় পালাবেন? মৃত্যু আপনার সামনে... এটা সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা চাওয়ার একটি উপলক্ষ। তাঁর এ অবৈজ্ঞানিক ও বাগাড়ম্বরপূর্ণ এ বক্তব্যে অনেকেই হতাশ হন। প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলেন মহানবীর (সা.) মহামারি ছোাঁয়াচে রোগ সংক্রান্ত অনবদ্য ও চমৎকার ব্যবস্থাপনাকে। যা কোনোভাবেই কাম্য ও প্রত্যাশিত হতে পারে না। আসলে ধর্মীয় জ্ঞানের গভীরে প্রবেশ না করে একদেকদর্শি চেতনায় এক রোখা ভাবে শরীয়াতের বিধান গ্রহণ করলে এবং সাথে আধুনিক ছোঁয়া না থাকলে যা হয় আর কি! পবিত্র হাজ্ব ও ওমরাহর কারণে অনেক দেশের লোকের সমাগমে সৌদি আরব সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সৌদি সরকার ও শরিয়াহ বোর্ডের দ্রুত এবং সাহসী পদক্ষেপে তিনটি ধাপে তারা মসজিদ থেকে সংক্রমণ বন্ধের উদ্যোগ নেয়।

প্রথম পর্যায়ে শুধু নামাজের সময়ে মসজিদ খোলা হয়, দ্বিতীয় পর্যায়ে ওমরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়, কাবাঘরসহ হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইব্রাহিমের চতুর্দিকে দেয়াল তুলে প্রবেশ বন্ধ করা হয় এবং তৃতীয় পর্যায়ে মসজিদুল হারাম ও মসজিদুল নববি ছাড়া সব মসজিদে জামাত নিষিদ্ধ করা হয়। ২১ দিনের কারফিউ চলমান, যে কারণে দেশটি তুলনামূলক অনেক ভালো অবস্থায় রয়েছে; যার মৃত্যু সংখ্যাও ৩০ এর মতো। মসজিদুল আকসা, কুয়েত ও ওমানে মসজিদে সব ধরনের জামাত বন্ধ করা হয়। এর পাশাপাশি ইরাক, কাতার, দুবাই, মিসর, তিউনেশিয়াসহ প্রায় সব মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে আজানে আসসালাতু ফি বুযূতিকুম্ বলে ঘরে নামাজ পড়ার জন্য বলা হচ্ছে। যার ফলে ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এই দেশগুলোয় সংক্রমণ এখনও কম।

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়াহ কাউন্সিল বলেছে, এই পরিস্থিতিতে সরকার মসজিদে সব ধরনের জামাত বন্ধ করতে পারে। আল-আজহারের জারি করা ফতোয়ায় বলা হয়, ‘মাকাসিদুশ শারয়্যিয়াহ’ বা ইসলামী আইনের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হলো, মানুষের জীবন বাঁচানো এবং যাবতীয় বিপদাপদ থেকে সবাইকে রক্ষা করা। এই বৃহৎ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই প্রতিটি মুসলিম দেশের রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের মসজিদে সম্মিলিত নামাজ আদায় এবং জুমার নামাজের ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপের অনুমতি রয়েছে। ফতোয়ায় আরও বলা হয়, মানবজীবন সুরক্ষার জন্য এই মুহূর্তে সব ধরনের সভা-সমাবেশ ও দোয়া অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করা উচিত। বিশেষ করে বলা হয়, যারা বয়োবৃদ্ধ, তারা নিজেদের ঘরেই নামাজ আদায় করবেন।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও জুমার নামাজে অংশ নেওয়ার জন্য মসজিদে যাবেন না। জনসমাগমের কারণে মসজিদে জামাতে নামাজ আদায়ও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার কারণ হতে পারে বলে ফতোয়াটিতে উল্লেখ করা হয়। যা বাস্তব সম্মত, সঠিক, যথার্থ ও সময়োপযোগী এবং ইসলাম সম্মত। সৌদি আরবের সিদ্ধান্তে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলেমরা সম্পৃক্ত। সৌদি আরবের ফতোয়া বোর্ড সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছে- চার কারণে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মসজিদে নামাজ না পড়ে নিজ ঘরে নামাজ আদায় করবেন। প্রথম অবস্থা: কেউ

যদি এই মহামারি রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। দ্বিতীয় অবস্থা: কেউ যদি কোয়ারেন্টাইনে থাকেন। তৃতীয় অবস্থা: কেউ যদি অন্যের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার ভয় করেন। চতুর্থ অবস্থা : কেউ পূর্ণ সুস্থ-সবল আছেন, কোনো ধরনের আশঙ্কা কিংবা আতঙ্ক নেই। কিন্তু সরকার মসজিদ বন্ধ করে দিয়েছে কিংবা নামাজ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি বাধ্যবাধকতা মেনে নেওয়ায় কোনো অসুবিধা নেই। রাজডিক্রিতে আরও বলা হয়ে, পরবর্তী নোটিশ না দেওয়া পর্যন্ত এ কারফিউ বলবৎ থাকবে। এদিকে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বের সব দেশের মুসলিমদের হজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত না নেওয়া এবং এ সংক্রান্ত কোনো চুক্তিতে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সৌদি আরবের হাজ্ব ও ওমরাহ বিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ সালেহ বেনতেন। আমাদের বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘরে নামাজ পড়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। এসব নির্দেশনা সঠিকভাবে মসজিদ কমিটি বা সাধারণ মুসল্লি হিসেবে আমাদের মানা উচিত। মানুষের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়টিকে হাল্কা ও ঠুনকো সাময়িক আবেগ তাড়িত চেতনায় ভাবলে চলবে না। বরং জীবন বাঁচানোর তাগিদে সরকারি হুকুম মানাও শরীয়াতের অন্যতম বিধান। আর এ মসজিদে জামাতের বিষয়টি শুধু আপদকালীন সময়ের জন্য।

এখানে মূল উদ্দেশ্য কিছু সময়ের অপেক্ষা, সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান, মুসল্লি কমে যাওয়া বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে মসজিদের কোনো ক্ষতি করা কোনো অবস্থায় কারোই কাম্য নয়; কাম্য হতেও পারে না। কারন মহান আল্লাহ বলেন, সেই ব্যক্তির চেয়ে জালেম আর কে আছে, যে আল্লাহর মসজিদগুলোতে তার নাম নিতে বাধা দেয় এবং একে বিরান করার চেষ্টা করে (২: ১১৪)। বর্তমানে এই করোনাকালে মসজিদগুলো সরকারের নির্দেশনা মানছে কিনা, তা নিয়ে মসজিদ কমিটির সঙ্গে একযোগে কাজ করা দরকার। সচেতন প্রত্যেক মানুষকে এগিয়ে আশা উচিৎ এ ক্ষেত্রে। আমরা দেখেছি, রাজধানীর মিরপুরে করোনা আক্রান্ত একজন বয়স্ক ব্যক্তি যিনি মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার কারণে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

আমরা জানি, ইসলাম আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত জীবন বিধান। আমাদের অতি আবেগের কারণে আমরা যেন ইসলামের মূল স্পিরিটবিরোধী কিছু না করি। করোনা থেকে নিজে বাঁচতে এবং অন্যকে বাঁচাতে এখন বাড়িতে নামাজ পড়াই শ্রেয়। মসজিদে নির্দিষ্ট ইমাম, মোয়াজ্জ্বিন, মোতাওয়াল্লিদের মধ্য থেকে স্বল্প সংখ্যক লোক নিয়মিত সালাত ও জুমুআ আদায় করবেন। মসজিদ বন্ধ করা হবে না বরং সাধারণ মুসল্লিরা সকলে নিজ নিজ বাড়ীতে সালাত আদায় করবেন। নিজের ছেলে- মেয়ে ও আত্মীয় পরিজনদের নিয়ে জামায়াতে সালাত আদায় করবেন। সালাত শেষে হাদীস পাঠ ও কোরআনের তাফসীর পাঠের মধ্য দিয়ে নিজের পরিবারের সদস্যদের ইসলামের ছায়াতলে আনার সুযোগ কাজে লাগানো অব্যাহত রাখতে পারেন। নিজের ভেতরের অন্তর্গত প্রাণশক্তি ইসলামী চেতনায় ঢেলে সাজানোর এটাই অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়। এ কোয়ারান্টাইনের এ সময়টাকে আত্মোপলব্ধি ও আত্মজাগরণের সময় হিসেবে বিগত দিনে নিজের কৃত কর্মের একটি আলেখ্য উপস্থাপন করে ভুলের জন্য তাওবা করে সামনের দিনে ভালো থাকা ও ভালো রাখার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া উচিৎ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকল কর্মকায কবুল করুন। রাখুন সবাইকে নিরাপদে। আমীন।

লেখক: পিএইচডি গবেষক, ইনস্টিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

ads