করোনাভাইরাস কি জীবাণু অস্ত্র?


মতামত

বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় সবগুলো রাষ্ট্রে কোভিড-১৯ করোনাভাইরাস বিস্তার লাভ করেছে। আধুনিক সভ্যতায় যখন পৃথিবীর মানুষ দেশ দেশান্তর ছাড়িয়ে গ্রহ উপগ্রহে পাড়ি জমাচ্ছে, টেকনোলজির পরিবর্তন ও পরিমার্জন এর ফল হিসেবে ইন্টারনেট, রোবট কিংবা ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির ব্যবহার শুরু হয়েছে। পদার্থ, রসায়ন কিংবা চিকিৎসা বিজ্ঞান সর্বক্ষেত্রে যখন জয়জয়কার। যখন পৃথিবীর শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো পারমাণবিক অস্ত্র, মিসাইল, সাবমেরিন কিংবা উন্নত প্রযুক্তির মারণাস্ত্রের মাধ্যমে নিজের শক্তির জানান দেয় ঠিক তখনি এমন একটি ক্ষুদ্র ভাইরাস পৃথিবীকে পুরোপুরি থমকে দেবে এ কথা কেউ ১০ বছর আগে ভবিষ্যদ্বাণী করলে হয়তো হাস্যকর মনে হতো।

কিন্তু এইটাই সত্য যে এই ক্ষুদ্র করোনা ভাইরাসের কারণে পৃথিবী এখন প্রায় পুরোপুরি অচল এবং মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। এ পর্যন্ত ১.২ মিলিয়ন এর বেশি মানুষ আক্রান্ত এবং ৬০ হাজার এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং প্রতিনিয়ত এই সংখ্যা বাড়ছেই।

গত বছরের শেষের দিকে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া এই কোভিড ১৯ করোনা ভাইরাস কয়েকমাসের ব্যবধানে এখন পুরো পৃথিবীতে ছেয়ে গেছে। আর এরই মধ্যে শুরু হয়েছে দোষারোপ। একেক দেশ একেক দেশকে বিভিন্ন তথ্য ও গোয়েন্দা সূত্রের মাধ্যমে দোষারোপ করছে। যার মধ্যে সব থেকে বেশি সন্দেহের তীর চীনের দিকে।

চীনকে দোষারোপ
কিছু দিন থেকেই লক্ষ্য করছি করোনা ভাইরাস কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
কিছু দিন আগে একটি খবর প্রকাশিত হয় যে ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়েস কলেজের আইনের অধ্যাপক মার্কিন আইনজীবী, রাসায়নিক মারণাস্ত্র বিরোধী সংগঠনের অন্যতম সদস্য ড. ফ্রান্সিস বয়েল দাবি করেন উহানের ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজির বায়োসেফটি লেভেল ফোর ল্যাবোরেটরিতে অতি গোপনে রাসায়নিক মারণাস্ত্র বানানোর প্রক্রিয়া চলছে। সেখান থেকেই ছড়িয়েছে এই ভাইরাসের সংক্রমণ। এই কথা বিলক্ষণে জানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং উহানের এই বায়োসেফটি লেভেল ফোর ল্যাবোরেটরিকে সুপার ল্যাবোরেটরির তকমা দিয়েছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বলা হয়েছিল, এই ল্যাবে ভাইরাস নিয়ে কাজ হলেও তা অনেক বেশি সুরক্ষিত ও নিরাপদ। ল্যাবোরেটরির জন্যই রয়েছে আলাদা উইং যার বাইরের পরিবেশের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই।
ড. ফ্রান্সিস বলেন, সার্স ও ইবোলা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠার পরে অভিযোগের আঙুল ওঠে এই গবেষণাগারের দিকেই। রোগ প্রতিরোধ নয়, বরং প্রাণঘাতী জৈব অস্ত্র বানাতেই মত্ত গবেষকরা। যারই পরিণতি হাজার হাজার মৃত্যু। নোভেল করোনা ভাইরাসের জিনগত বদল ঘটানো হয়েছে এবং উহানের এই ল্যাবোরেটরি থেকেই যে ভাইরাস ছড়িয়েছে সেটাও জানেন ডব্লিউএইচওর অনেক গবেষকই। কানাডার ল্যাব থেকে করোনা চুরি করেছে চীন, তারই জিনগত বদলে তৈরি হয়েছে নোভেল করোনা।

এছাড়া নোভেল করোনাভাইরাস যে রাসায়নিক মারণাস্ত্র, নিশ্চিত করেছেন মার্কিন সিনেটর টম কটনও। তাঁর দাবি, চীন জীবাণুযুদ্ধের জন্য বানাচ্ছিল ওই ভাইরাস। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কথাটা লুকোতে চাইছেন কারণ আন্তর্জাতিক আইনে জীবাণুযুদ্ধ নিষিদ্ধ। তাঁরা ওই নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করছিলেন জানাজানি হলে শাস্তির মুখে পড়তে হবে।

এর বাইরেও দুটি দাবি ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে দুনিয়া জুড়ে। প্রথমটি হল ইজরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ সন্দেহ করেছে, রহস্যময় ‘নোভেল করোনা ভাইরাসের’ চাষ করেছে চিনের গোপন সামরিক গবেষণাগার। দ্বিতীয় দাবি, মার্কিন পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট এই দাবিকেই সমর্থন করেছে।
ইসরায়েলি সেনা গোয়েন্দা দফতরের প্রাক্তন প্রধান লেফটেন্যান্ট ড্যানি শোহাম জানিয়েছেন, ‘বায়ো-ওয়ারফেয়ার বা জীবাণু যুদ্ধের জন্য তৈরি হচ্ছে চীন। জিনের কারসাজিতে এমন ভাইরাস তৈরি করা হচ্ছে, যা মিসাইল, ড্রোন, বোমা বা সামান্য একটি পেন অথবা ঘড়ির মধ্যে দিয়েই ছড়িয়ে দেওয়া যায় শত্রুর ভূখণ্ডে। সেই ভাইরাসের দাপটে ২৫ দিনের মধ্যেই মৃত্যুমিছিলে উজাড় হয়ে যেতে পারে একটি বড় শহর বা একটি জেলা।’ ইসরায়েলের সেনা গোয়েন্দাদের উদ্ধৃত করে মার্কিন সিসিএন-সহ ইসরায়েলের একাধিক ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর ব্যাপক আধুনিকীকরণ, ছাঁটাই প্রক্রিয়া ও প্রযুক্তিগত মানোন্নয়ন করছে চীন। চলছে জীবাণু অস্ত্র ও রাসায়নিক অস্ত্র নিয়েও গবেষণা। এরই অংশ হিসেবে সার্স জাতীয় ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করছে চীনের সামরিক বাহিনীর গবেষণাগার। শক্তিশালী জীবাণু অস্ত্র তৈরি করতে গিয়ে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে বলে দাবি করেছেন ইসরায়েলের জীবাণু অস্ত্রের বিশেষজ্ঞরা। এই ভাইরাসের জন্মদাতা উহানের জৈব রাসায়নিক মারণাস্ত্র তৈরির কারখানা বায়ো-সেফটি লেভেল ৪ ল্যাবোরেটরি। ইসরায়েলের দাবি, অসাবধানতাবশত এই গবেষণাগার থেকেই ছড়িয়েছে ভাইরাসের সংক্রমণ। আসলে জৈব রাসায়নিক অস্ত্রের উপর গবেষণা করতে গিয়েই দুর্ঘটনা ঘটিয়েছেন চীনের বিজ্ঞানীরা।

২০১৫ সালে রেডিও ফ্রি এশিয়া তাদের রিপোর্টে দাবি করেছিল, উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজিতে ভয়ঙ্কর, প্রাণঘাতী সব ভাইরাস নিয়ে কাজ করছেন গবেষকরা। এর অর্থ জৈব রাসায়নিক মারণাস্ত্রের দিকে ক্রমশ ঝুঁকছে বেইজিং।

তবে এ বিষয়ে দ্বিমতও রয়েছে।
ক্রিস্টিয়ান অ্যান্ডারসন নামক এক গবেষক বিজ্ঞান জার্নাল নেচার ম্যাগাজিনে এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য শেয়ার করেছেন। তিনি সাফ জানাচ্ছেন কোভিড-১৯ একটি প্রাকৃতিক ভাইরাস। কোনও রসায়নাগারে একে তৈরি করা হয়নি।
নিউ অরল্যন্সের তুলান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজিস্ট রবার্ট গ্যারিও সমানতালে গবেষণা করে যাচ্ছেন করোনার চরিত্র নিয়ে। তাঁর বক্তব্য উহানের ভাইরাস গবেষণাগারের লাগোয়াই মাছবাজার। তাই এই তত্ত্ব খুব সহজে ছড়ায় যে চিন এই ভাইরাসকে তৈরি করেছে। সরাসরি এই তত্ত্বকে খারিজ করছেন গ্যারিও ক্রিস্টিয়ান অ্যান্ডারসন।
বিজ্ঞানীদ্বয় বলছেন, একটি ভাইরাসকে কৃত্তিমভাবে প্রস্তুত করলে তা পূর্ববর্তী কোনও ভাইরাসের চরিত্র লক্ষণ অনুযায়ীই তৈরি করতে হয়। এমনও হতে পারে একাধিক ভাইরাসের গুণাগুণ মিশিয়ে একটি ভাইরাস তৈরি করেন। সেক্ষেত্রে নতুন ভাইরাসটির মৌলিক কোনও চরিত্র থাকে না। কিন্তু করোনার ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো। তার নিজস্বতা রয়েছে। এই নিজস্বতা সে অর্জন করেছে প্রকৃতি থেকেই।

এই ভাইরাসের জিনের গঠন দেখেও বোঝা যায় অন্য কোনও ভাইরাসকে ভিত্তি করে তাকে তৈরি করা হয়নি। এখানেই থেমে যাননি বিজ্ঞানীরা। তাঁরা দেখাচ্ছেন প্যাঙ্গোলিন ভাইরাস বা ব্যাট ভাইরাসের সঙ্গে মিলও রয়েছে এই করোনা ভাইরাসের। এই ভাইরাসগুলির গঠন সম্পর্কেও জানা গিয়েছে সম্প্রতি। কাজেই রাতারাতি কৃত্তিম ভাইরাস তৈরি করাও সম্ভব নয়।

অন্যদিকে ব্লুমবার্গের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিজ ভূখণ্ডে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের মাত্রা গোপন করেছে চীন। মৃত্যু ও আক্রান্তের সঠিক সংখ্যা প্রকাশে তারা ব্যর্থ হয়েছে। হোয়াইট হাউসে পাঠানো এক গোপন প্রতিবেদনে মার্কিন গোয়েন্দারা এ তথ্য দিয়েছে। প্রতিবেদনের মূল ধারণায় তারা বলেছেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যু নিয়ে চীনের সরকারি প্রতিবেদন ইচ্ছাকৃতভাবে অসম্পূর্ণ রাখা হয়েছে।
এছাড়া ব্লুমবার্গের অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস ছড়ানোর অভিযোগ এনে চীনের বিরুদ্ধে ২০ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করা হয়েছে আমেরিকায়।
আমেরিকার কয়েকজন সাধারণ নাগরিক ও ব্যবসায়ী গত ১২ মার্চ ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট আদালতে এ মামলা করেন।
মামলার আর্জিতে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাস মোকবেলায় চীন সরকারের ভুল পদক্ষেপের কারণে তারা বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।


এ সকল বিষয় নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দাসংস্থা ও বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের বার বার চীনের দিকে দৃষ্টি দেয়ার কারণ হলো, ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে চীন সরকার সংক্রমিত এলাকা সম্পূর্ণ লকডাউন করে এবং সেখানে সংবাদমাধ্যমকেও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে সেখানে সঠিক তথ্য সরেজমিনে তুলে আনতে পারেনি কেউ। এজন্য চীনা কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্যেই ভরসা রাখতে হয়েছে সবাইকে।

এছাড়াও আরও একটি ঘটনা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। চীনা সরকারি সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩৪ বছরের লি ওয়েনলিয়াং প্রথম করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন। উহানের সরকারি হাসপাতালে ৬ ফেব্রুয়ারী যার মৃত্যু হয়। গত ডিসেম্বরে স্থানীয় সাতজন রোগী সার্সের মতো ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। লি তখনই আশঙ্কা করেছিলেন, করোনা ভাইরাস মহামারীর আকার নিতে পারে। সে কথা বাকি চিকিৎসকদেরও বলেছিলেন তিনি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভাইরাল হয় লিয়ের মেসেজ। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ। লিয়ের কথায় বিশ্বাস করেনি পুলিশ।

এদিকে সারা বিশ্ব যখন করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে দিশেহারা। দিন দিন বেরেই চলছে আক্রান্তের সংখ্যা এবং মৃত্যুর মিছিল। উন্নত দেশগুলোর চিকিৎসা ব্যবস্থাও যেখানে অসহায় সেখানে এই ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল চীনের এই বিপদ এত কম সময়ের মধ্যে কাটিয়ে ওঠাকেও এক গভীর ষড়যন্ত্র ভাবা হচ্ছে। গত তিন মাসে ৯০ হাজার এর কাছাকাছি করোনা রোগীর ৯০ ভাগেরও বেশি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। যেখানে আমেরিকা এবং ইউরোপের দেশগুলো কোনমতেই এর কূলকিনারা পাচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রকে দোষারোপ

একজন চীনা কূটনীতিক তার টুইটার অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে সরাসরি ইঙ্গিত করেছেন, উহানে গত বছর অক্টোবর মাসে একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আসা মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি দল এই ভাইরাস ছড়িয়ে গেছে।
চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্রও ঝাও লিজিয়িান টুইটারে মার্চের ১১ তারিখে মার্কিন একটি কংগ্রেস কমিটির সামনে সেদেশের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের (সিডিসি) প্রধান রবার্ট রেডফিল্ডের একটি শুনানির ভিডিও ক্লিপ পোষ্ট করেছেন। ঐ ফুটেজে মি রেডফিল্ড যুক্তরাষ্ট্রে কিছু ইনফ্লুয়েঞ্জা-জনিত মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে বলছেন, পরীক্ষায় দেখা গেছে কোভিড-নাইন্টিনের কারণেই ঐ মৃত্যু।

চীনের পাশাপাশি ইরানও মনে করছে এ জীবাণু ছড়িয়েছে আমেরিকা। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের কম্যান্ডার মেজর জেনারেল হুসেইন সালামি সরাসারি বলেছেন, করোনাভাইরাস যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি জীবাণু অস্ত্র। গত পাঁচই মার্চ জে. সালামি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে চীনে এবং পরে ইরানের বিরুদ্ধে "জীবাণু-অস্ত্রের সন্ত্রাসী হামলা" চালিয়েছে। পরদিনই ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য হেশমাতোল্লাহ ফাতালহাতপিশে মন্তব্য করেন, "ট্রাম্প এবং পম্পেও করোনা নিয়ে মিথ্যা কথা বলছেন...এটা কোনো সাধারণ রোগ নয়, এটা ইরান এবং চীনের বিরুদ্ধে জীবাণু অস্ত্রের হামলা।"

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
রাশিয়ার ভেতর থেকে সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়াও রাশিয়ার সরকারের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন মিডিয়ায় চীন এবং ইরানের এসব অভিযোগ-তত্ত্ব জোরেসোরে প্রচার করা হচ্ছে। রুশ বিভিন্ন মিডিয়ায় এই ভাইরাস ছড়ানোর জন্য ব্রিটেনকেও দায়ী করা হচ্ছে। সরকার সমর্থিত স্পুটনিক রেডিওতে একটি অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে, ব্রেক্সিটের পর বাজার খুলে দেওয়ার জন্য চীনকে বাধ্য করতে ব্রিটেন এই কাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে। রুশ একটি জনপ্রিয় টিভি টকশোতে (দি বিগ গেম) ইগর নিকুলিন নামে রুশ একজন মাইক্রোবায়োলজিস্ট বলেন, ব্রিটেন এই করোনা 'অস্ত্র' তৈরি করেছ। তিনি বলেন, "(ব্রিটেনের) পোর্টান ডাউনে একটি গবেষণাগারে বহুদিন ধরেই নানা জীবাণু এবং রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির কাজ চলছে।"

ইরানকে দোষারোপ
ইরানকে কেউ সরাসরি কোন কারণ দেখিয়ে দোষারোপ না করলেও আমেরিকা বার বার ইরানকে সতর্ক করছে।

জীবাণু অস্ত্র, ক্ষমতার বিচারে কতটা প্রয়োজন?

কোভিড ১৯ করোনা ভাইরাস মানব সৃষ্ট হোক কিংবা প্রাকৃতিক, আমি মনে করি জীবাণু অস্ত্র ক্ষমতার বিচারে বিভিন্ন সময়ে অনেক বেশি সহায়ক ভুমিকা পালন করেছে। একটি জীবাণু একটি যুদ্ধের চেয়েও ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে যেমন করোনা ভাইরাসের কারণে শুধু যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি হারাবে প্রায় ৭ কোটি মানুষ এছাড়া বিভিন্ন দেশের নৌবহর ও বিমান বহরের জন্য ত্রাসসৃষ্টিকারী যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক রণতরী থিওডোর রুজভেল্ট এর শতাধিক নাবিক করোনায় আক্রান্ত।

বিশেষজ্ঞরা জীবাণু অস্ত্র প্রয়োগের মাধ্যমে সংঘটিত যুদ্ধকে অভিহিত করেছেন বায়োলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার বা জীবাণু যুদ্ধ নামে। জীবাণুযুদ্ধের প্রথম ব্যবহার লক্ষ করা যায় ১৩৪৬ সালে।

তৎকালীন তাতার বাহিনী প্লেগ রোগে মৃত সৈন্যদের কাফা শহরের মধ্যে ফেলে দিয়ে সব প্রবেশপথ বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়েছিল। ১৭৬৭ সালে সংঘটিত ফরাসি ও ভারতীয়দের মধ্যকার যুদ্ধে ফরাসি সৈন্যরা গুটিবসন্তের জীবাণুতে ভরা কম্বল তৎকালীন স্থানীয়দের মাঝে বিতরণ করেছিল। যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ জনগণের মাঝে গুটি বসন্ত ছড়িয়ে দেয়া।

১৯০০ সালে এসে যখন মাইক্রোবায়োলজি বা অণুজীবভিত্তিক সংক্রামক রোগের উদ্ভব হলো, তখন থেকেই আধুনিক জীবাণু অস্ত্রের ধারণার শুরু।১৯২৫ সালের জেনেভা প্রটোকলে জীবাণু অস্ত্র গবেষণা ও ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও উন্নত দেশগুলোতে এর ব্যবহার থেমে থাকেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চীনের ওপর জাপানের জীবাণু অস্ত্র ব্যবহার, বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ব্রিটেন, রাশিয়া এবং আমেরিকার গবেষণা ও উন্নয়ন প্রভৃতি প্রমাণ করে মারণাস্ত্র হিসেবে জীবাণু অস্ত্রের জনপ্রিয়তা কেমন। তবে আশার কথা হচ্ছে, ১৯৬৯ সালের ২৫ নভেম্বর এক বিবৃতিতে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন তার দেশে জীবাণু অস্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে ঘোষণা দেন।

প্রকৃতপক্ষে, গত আড়াই দশকে একের পর এক ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে বিশ্ববাসী। সার্স, সোয়াইন ফ্লু, নিপাহ, এনকেফেলাইটিস, ইয়েলো ফিভার, ইবোলাসহ হরেক রকমের ভাইরাসের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হচ্ছে।

জীবাণু অস্ত্র ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ এবারই প্রথম না; এর আগেও হয়েছে। ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই জীবাণু অস্ত্রের ধারণাও ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০–৮১ সাল পর্যন্ত কিউবাতে ডেঙ্গু জ্বরে কয়েক লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। মতান্তরে কেউ কেউ বলেন, এর সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ। ওই সময় কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো অভিযোগ করেছিলেন, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল যুক্তরাষ্ট্রের জীবাণু অস্ত্রের আক্রমণে। পেন্টাগন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দিয়ে থাকে জীবাণু অস্ত্র নিয়ে গবেষণা করার জন্য। এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। অভিযোগ রয়েছে অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন দেশে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নামে জীবাণু অস্ত্রের গবেষণাগার গড়ে তোলে। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত মার্কিন সামরিক বাহিনীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পোকামাকড়ের মাধ্যমে জীবাণু অস্ত্র ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের ছিল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ আ্যালগিপ্টি মশার মাধ্যমে আফ্রিকায় ইয়েলো ফিভার ছড়ানো হয়।

জীবাণু অস্ত্রের উন্নততর গবেষণা ও ব্যবহার ক্রমেই অস্থিতিশীল করে তুলছে গোটা বিশ্বকে। যার প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। জীবাণু যুদ্ধে ব্যবহৃত এজেন্টগুলোকে উন্নততর প্রযুক্তির মাধ্যমে জেনেটিক্যালি বদলে ফেলে স্বাভাবিক কার্যক্ষমতার থেকে কয়েকশত গুণ বেশি কর্মক্ষম করে তোলা হচ্ছে।

করোনার উৎপত্তি ও বিস্তারের কারণ যা–ই হোক না কেন, এটাকে জীবাণু অস্ত্র মনে করার কারণ হচ্ছে রাষ্ট্রগুলোর বায়োপাওয়ার বা জৈবশক্তি প্রয়োগের অভ্যাস। তাই করোনার ক্ষেত্রে জীবাণু অস্ত্রের ধারণা একেবারেই বাতিল করে দেওয়া যায় না।

তাছাড়া বর্তমান পৃথিবীর বেশ কিছু দেশের রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র এবং অধিকাংশ দেশের কাছেই রয়েছে উন্নত প্রযুক্তির মারণাস্ত্র। এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে কোন দেশই অস্তিত্ব বিলীনের ঝুঁকি ও যুদ্ধাপরাধের দায় সরাসরি ধারন করতে চাইবে না। ফলস্রুতিতে নীরব যুদ্ধে সহায়ক ভূমিকা রাখবে জীবাণু অস্ত্র।

লেখকঃ- -শিক্ষার্থী, ৩য় বর্ষ, অপরাধতত্ত্ব ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

আরএইচ/আওয়াজবিডি

ads