খালেদা জিয়ার মুক্তি গণমাধ্যমের ব্যর্থতা, শোডাউন বিএনপির লজ্জা


পীর হাবিবুর রহমান

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির নেপথ্যে বিএনপির নেতাকর্মীদের নূন্যতম ভূমিকাই নেই। এমনকি সরকারের মন্ত্রী নেতারাও জানতেন না। বিএনপির নেতাদের তো জানার কথাই নয়। যদি কেউ টের পেয়ে থাকেন তবে তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়ে থাকতে পারেন। তিনি তার দলের নেত্রীর জন্য প্রধানমন্ত্রীর সাথে একটা যোগাযোগ রাখতেন। তাও মুক্তির বিষয়ে কতোটা নিশ্চিত সেটিও সন্দেহের।

এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়ে আইনমন্ত্রীকে বলার আগে তিনিও জানতেন না। জানতেন না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। এমনকি মুক্তির বিষয়টি নিয়ে কারাবন্দি বেগম খালেদা জিয়ার বোন ও ভাই যখন ক’দিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দেখা করতে গেলেন, অনুরোধ জানালেন সেটি গণমাধ্যম আঙ্গিনা যতোই বড় হোক, সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা যতোই অনেক সংবাদকর্মীর থাকুক বা দুই দলের অন্ধ দলকানা যতো বড় গণমাধ্যমের হর্তাকর্তাই থাকুন না কেনো তারাও জানা দূরে থাক, এটা টের পর্যন্ত পাননি।

খালেদা জিয়ার ভাইবোনেরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করেছেন এ সংবাদটুকু টিভি, সংবাদপত্র, নিউজপোর্টালের সরকারিদল বা প্রধানমন্ত্রী বা গণভবন বিটের রিপোর্টার জানেন না এটা পেশাগত জায়গায় তাদের বড় ব্যর্থতা। রিপোর্টার জীবন এখনো টানে। সেই অনুভূতি ও কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি আমরা যখন রাজনৈতিক রিপোর্টার তখন এমন নিউজ মিস হবার প্রশ্নই উঠে না। রিপোর্টারদের জীবনে এমন এক্সক্লুসিভ সুযোগ কম আসে। বারবার আসে না। এটা তারা হারিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ পাবার পরেই কেবল আইনমন্ত্রী যখন গণমাধ্যম কর্মীদের তার বাসভবনে ডেকে বললেন তখনই সবাই জানলেন। এ খবর সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারাও শুনে তব্দা হয়ে যান। এমন চমক অপেক্ষা করছে করোনায় বিমর্ষ পৃথিবীর সঙ্গে আক্রান্ত বাংলাদেশের সবাইকেও তাজ্জব বানিয়ে দিয়েছে।

বিএনপির অনেকে যেমন বড় বড় কথা বললেও তাদের নেত্রীর মুক্তির জন্য আন্দোলন করা দূরে থাক সারাদেশে একটা পোস্টারও লাগাতে পারেননি তেমনি আওয়ামী লীগের অনেক মন্ত্রী নেতাও নির্বোধের বাকযুদ্ধ করেছেন। শেখ হাসিনার মনোজগৎ পাঠে ব্যর্থ হয়েছেন। আজ সরকারি দলের অনেকেও খুশিতে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন! যদি মনেই করেন মুক্তি দেয়া সঠিক তাহলে দলীয় ফোরামে বলেননি কেনো? সত্য বলতে না পারা কোন রাজনীতি!

সত্যটা হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়াকে মানবিক কারণে মুক্তিদানের জন্য তার ভাইবোনরা গভীর বেদনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনুরোধ করেছেন, তিনি সেই মানবিক ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তি দিয়েছেন তার নির্বাহী ক্ষমতায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন দেশে তার উদার রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিশাল হৃদয়ের উচ্চতায় দাঁড়িয়ে দালাল আইনে আটক সবুরখান, শাহ আজিজুর রহমানদের চিঠি পেয়ে রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদদের এভাবে মুক্তির নির্দেশই দেননি, জেল থেকে বাড়ি পৌঁছে দেবার কথাও বলেন। তাদের আর্থিক সহায়তাও দেন।

বঙ্গবন্ধুর মতোন মহান হৃদয়ের ও দুর্ধর্ষ সাহসী নেতা এদেশ কেনো বিশ্বরাজনীতিতেও আর আসবেন না। যাই হোক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বাইরে কঠোর হলেও খালেদা জিয়ার ভাইবোনের হৃদয়ের আকুতি তার কোমল হৃদয়ে গ্রহণ করেই মুক্তি দিয়েছেন। কারও সাথে পরামর্শও করেননি। যদিও প্রয়াত সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বলেছিলেন, ‘বাঘে ধরলে ছেড়ে দেয়, শেখ হাসিনা ধরলে ছাড়ে না।’ কিন্তু প্রমাণ হলো রাষ্ট্রনায়কের মন কঠোর কোমলে বড়ই হতে হয়। তাই শেখ হাসিনাও ছাড়েন। রাজনীতিতে দূরদর্শী প্রাজ্ঞ অভিজ্ঞ শেখ হাসিনা যখন গোটা জাতি বিষন্ন পৃথিবীর সঙ্গে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে তখন এ মুক্তি দিয়ে নিজেই বড় হয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু কন্যার রাজনৈতিক ও মনোজগতে যদিও ৭৫ সালের পরিবারের লোমহর্ষক নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড, তার পরবর্তীতে সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের দমন নির্যাতন আচরণ, পরবর্তী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলেও বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার না করা, ২০০১ সালে দ্রুত গণভবন ছাড়তে বাধ্য করা, জাতীয় শোক দিবসে কেককাটা ও একুশের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার মতোন তার ওপর চালানো ভয়াবহ প্রতিহিংসার রক্তক্ষরণ রয়েছে। তবু অসুস্থ ৭৫ উর্ধ্ব সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন থেকে রাজনীতিতে উঠে আসা গণতন্ত্রের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি জাতির পিতার কন্যা হিসেবে শেখ হাসিনার সঠিক সিদ্ধান্ত। সবমহল এটাকে অভিনন্দিত করেছে।

এখন এটা নিয়ে নানা কথা, বাঁকা ইঙ্গিত হিসেব যারা করছেন তারা খালেদা জিয়ার বিপদে কিছু করা দূরে থাক বরং ক্ষমতায় থাকতে উগ্র দম্ভ হঠকারিতা করে বিপদে তাকেই ফেলেননি দলকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। যারা মুক্তির পর মিছিল নিয়ে শোডাউন করে গুলশানে গেছেন,তারা জানেন না করোনা কতটা ভয়ঙ্কর? এটা ছোঁয়াচে এবং অসুস্থ বয়স্কদের জন্য বিপদজনক? তাহলে ১১ বছরের ব্যর্থদের আজ এ বীরত্বের মানে কি? এটাতো বিএনপির নেতাকর্মীদের জন্য গ্লানি লজ্জা বেদনার। রাজনীতি ও দলের জন্য, শাসনামলে অযোগ্যদের ভুলের জন্য জেল খাটলেন খালেদা জিয়া, মুক্তিতে ভূমিকা রাখলেন তার ভাইবোন প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে, আর এখন বীররা বের হয়ে এসে এ শোডাউন কেনো? এর কোনো জবাব আছে সবাইকে করোনার ঝুঁকিতে ফেলা ছাড়া অর্জনটা কি প্রশ্নের?

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

রেদওয়ানুল/আওয়াজবিডি

ads