ভোট জালিয়াতির মামলায় যুক্তরাষ্ট্রে দুই বাংলাদেশি গ্রেফতার


গ্রেফতার

যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির প্যাটারসন সিটি কাউন্সিল নির্বাচনে দুই বাংলাদেশি প্রার্থীর ভোট গণনার জটিলতার মধ্যেই এক প্রার্থীর ভাইসহ দুইজনকে ভোট জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেফতার করেছে এফবিআই। ডাকযোগে আনা ব্যালটের মাধ্যমে শাহীন খালিক নামক এক প্রার্থীর বিজয় ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে প্রতারণার মামলা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

১৯ মে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বাংলাদেশি অধ্যুষিত দুই নম্বর ওয়ার্ডের বিদায়ী কাউন্সিলম্যান শাহীন খালিকের বিরুদ্ধে লড়েন মোহাম্মদ আকতারুজ্জামান। ভোট গণনা শেষে শাহীনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।তিনি পান ১৭২৯ ভোট।অপরদিকে দ্বিতীয় স্থান অধিকারী মোহাম্মদ আকতারুজ্জামান পান ১৭২১ ভোট।

নির্বাচন কমিশনের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে পুনরায় গণনার আবেদন জানান আক্তারুজ্জামান। দ্বিতীয় বারের গণনায় আকতারুজ্জামানের ভোট বাড়ে।

তবে শাহীন খালিক এগিয়ে থাকেন ৩ ভোটে। এরপর আবারও গণনার অনুরোধ জানালে তৃতীয় দফায় উভয়ের সমান ভোট হয়।

উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে মামলার উদ্ভব হওয়ায় নির্বাচন কমিশন দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকার মধ্যেই নিউজার্সি স্টেট এটর্নী জেনারেল অফিস থেকে ভোট নিয়ে প্রতারণা, ভোট ডাকাতি এবং ভোট গণনার ফলাফল নিয়ে কারচুপির তদন্ত শুরু হয়। তদন্তের পরই গত ২৫ জুন শাহীন খালিকের বড়ভাই সেলিম খালিক (৫১) এবং তার সমর্থক আবু রেজিয়েনকে (২১) গ্রেফতার করা হয়।

সিলেটের বিয়ানিবাজারের সন্তান সেলিম খালিক বাস করতেন প্যাটারসন সিটির ওয়েন এলাকায়।তার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ করা হয়েছে যে, ডাকযোগে আসা ব্যালট গণনায় প্রতারণা (তৃতীয় ডিগ্রি), বেআইনিভাবে ব্যালট নিজের কব্জায় রাখা (তৃতীয় ডিগ্রি), সরকারি নথির পরিবর্তন ঘটানো এবং ভোট গণনার ফলাফলে মিথ্যা তথ্য প্রদান (চতুর্থ ডিগ্রি) করেছেন উদ্দেশ্যমূলকভাবে।

এটর্নী জেনারেল গুরবির গ্রুয়েল চাঞ্চল্যকর ভোট জালিয়াতি ও প্রতারণার মামলার পর গণমাধ্যমকে জানান, খালিক নির্বাচনের বিধি লঙ্ঘন করে প্যাটারসন সিটির দুই নম্বর ওয়ার্ডের একজন ভোটারের বাসায় যান এবং তার কাছ থেকে একাধিক ব্যালট সংগ্রহ করেন। অথচ সেগুলো বিধি অনুযায়ী ডাকযোগে নির্বাচন কমিশনের অফিসে আসার কথা। খালিক সেগুলো এনে নির্বাচন কমিশনে জমা দেন। সে সময় নির্বাচন কমিশনকে নিশ্চিত করতে পারেননি যে, ভোটারেরাই তাকে লিখিত অনুমতি দিয়েছেন ব্যালট পেপার বহনের জন্যে।

এ সময় এটর্নী জেনারেল আরও উল্লেখ করেন যে, খালিকের একটি বাস কোম্পানী রয়েছে-‘এ-১ ইলেজেন্ট ট্যুরস’ নামে। ‘ইস্টার্ন স্টার ট্র্যান্সপোর্টেশন, এলএলসি’ নামে (স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী পরিবহন) সে ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। সে ব্যবসায়ও জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। পৃথকভাবে সেগুলোর তদন্ত চলছে।

একইসাথে গ্রেফতার প্রসপেক্ট এলাকার অধিবাসী আবু রেজিয়েনের বিরুদ্ধে ডাকযোগে আসা ভোট প্রদানে প্রতারণা (তৃতীয় ডিগ্রি) এবং বেআইনিভাবে নির্বাচনের ব্যালট দখলে রাখা (তৃতীয় ডিগ্রি)’র অভিযোগ করা হয়েছে আদালতে। এটর্নী জেনারেল উল্লেখ করেন, কমপক্ষে তিনটি ব্যালট পেপার ভোটারের কাছ থেকে ক্রয় করেন এবং তা নিজের দখলে রাখেন। এসব ব্যালট তার কাছে রাখার অনুমতি ছিল না সংশ্লিষ্ট ভোটারের পক্ষ থেকে।

এ ঘটনার তদন্তের সময় আবুর কাছে একটি ইউএসবি ড্রাইভ পাওয়া যায়। সেটি যাচাইকালে ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় যে, তিনি তিনটির অধিক ব্যালট প্রদর্শন করছেন যেগুলো পূরণ করা হয়নি। কিংবা প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ইনভেলাপে ভরাব ছিল না। অর্থাৎ তিনি ব্যালট সংগ্রহ করেছেন এবং নিজ ইচ্ছায় ভোট দেবেন, যদিও ব্যালটগুলো তার নয়।

এটর্নী জেনারেল গ্রেফতার অভিযানের তথ্য প্রকাশকালে বলেছেন, একইসাথে একই সিটির আরও দুই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে ভোট জালিয়াতির অভিযোগে। তাদের মধ্যে একজন হলেন বর্তমান কাউন্সিলম্যান মাইকেল জ্যাকসন (৪৮) এবং আরেকজন নির্বাচিত কাউন্সিলম্যান আলেক্স ম্যান্ডেজ (৪৫)। এর মধ্য দিয়ে আমরা সকলকে জানাতে চাই যে, আপনি যদি নিউজার্সির কোনো পর্যায়ের নির্বাচনের ফলাফল জালিয়াতি/প্রতারণার মাধ্যমে পরিবর্তন করতে চান, তাহলে অবশ্যই আমরা তা বরদাশত করবো না। অবশ্যই আপনাকে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে মানুষের বিদ্যমান আস্থায় সন্দেহের বা প্রশ্নের উদ্রেক ঘটতে পারে-এমন কোনো আচরণকেই আমরা সহ্য করবো না। ’

অভিযোগ প্রমাণিত হলে সেলিম খালিকের সর্বোচ্চ ১৬ বছর এবং আবু রেজিয়েনের সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড হতে পারে বলেও উল্লেখ করেছেন এটর্নী জেনারেল।

জানা গেছে, মামলার তথ্য প্রকাশের সময় অভিযুক্তরা এটর্নীসহ হাজির হয়েছিলেন। ফলে দ্রুত জামিন লাভ করেন দু’জনেই।

উল্লেখ্য, এই আসনে সর্বপ্রথম বাংলাদেশি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন মোহাম্মদ আকতারুজ্জামান। চার বছরের মেয়াদ শেষে পুনরায় প্রার্থী হলেও শাহীন খালিকের কাছে তিনি পরাজিত হন নিজের অবস্থানের ঠিকানা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়ায়। শাহিনের চার বছর শেষ। পুনরায় প্রার্থী হয়েছিলেন এ নির্বাচনে। শাহীন খালিকের বাড়ি সিলেটের বিয়ানিবাজার এবং আকতারুজ্জামানের বাড়ি সিলেট সদরে।

গত ৮ বছর ধরেই এই ওয়ার্ডের নির্বাচন ঘিরে নিজেদের মধ্যে বাক-বিতণ্ডার উদ্ভব হলেও এই প্রথম ভোট জালিয়াতির মামলায় গ্রেফতারের ঘটনা ঘটলো-যা কমিউনিটিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। কারণ, এর জের পড়ছে গোটা বাংলাদেশি কমিউনিটির ওপর। একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ফলে প্রকারান্তরে গোটা কমিউনিটিই অসাদাচরণে লিপ্ত থাকার তথ্য প্রশাসনে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে প্যাটারসনের প্রবীন একজন প্রবাসী নাম গোপন রাখার শর্তে এ সংবাদদাতাকে বলেন, ‘যারা অভিযোগ করেছেন, তারাও যে ধোয়া তুলসী পাতা, সেটি ভাবার অবকাশ নেই। ’

ads