করোনার প্রভাবে কাঁচামাল সংকটে বাংলাদেশ


করোনা

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে চীনের অধিকাংশ কারখানা বন্ধ থাকায় সময়মতো বাংলাদেশে আসছে না বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল। যার প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে। ফলে শিগগিরই কাঁচামাল সংকটে পড়তে যাচ্ছে দেশের কারখানাগুলো।

আমদানির নতুন এলসি বা ঋণপত্র কমে যাওয়ায় ব্যাংকের মুনাফাতেও ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। এমনকি সরকারের চলমান ১ লাখ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। একইসঙ্গে ক্ষতির মুখে পড়েছেন দেশের কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং সেবা খাতের উদ্যোক্তারা। আর চীননির্ভর নিত্যপণ্যের বাজারও হচ্ছে ঊর্ধ্বমুখি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় দি ফেডারেশন অফ বাংলাদেশ চেম্বার্স অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) সদস্যভুক্ত ২৫টি বাণিজ্যিক সংগঠনের মতামত থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

শুধুমাত্র বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিসিআই) বলেছে, করোনাভাইরাসের প্রভাবে বাংলাদেশের বাজারে এখন পর্যন্ত কোনো পণ্যের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়ার কারণ নেই। নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে এ মন্তব্য করলেও অন্যান্য শিল্পের কাঁচামালের বিষয়ে তাদের কোনো মতামত নেই।

এফবিসিসিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত চীন থেকে থেকে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর উপকরণসহ নানা ধরনের শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি স্ক্রু ড্রাইভার থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পের যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী কাঁচামাল, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ, রাসায়নিক দ্রব্য, ইলেকট্রিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট, ইলেকট্রনিক্সসহ সকল ধরনের তৈরি পণ্যই চীন থেকে আমদানি করা হয়। এছাড়া খাদ্য থেকে শুরু করে মসলা, খেলনা, প্লাস্টিক পণ্য, ভারী শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি হয় চীন থেকে। আবার রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের মেশিনারিজ, কাঁচামাল, প্রাথমিক পণ্যও আমদানি করা হয়।

বিশেষ করে দেশের প্রধান রফতানি পণ্য পোশাকখাতের ফেব্রিক্স ও সিনথেটিক ইয়ার্ণের প্রধানতম উৎস্য হচ্ছে চীন। পোশাকখাতে বিশেষ করে ওভেন খাতের কাঁচামাল যোগানের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ  এবং নীট খাতে ১৫ থেকে ২০ শতাংশের উৎস হচ্ছে চীন। এছাড়া অন্যান্য অনেক শিল্প খাতের প্রধান কাঁচামালের উৎস হচ্ছে চীন।

গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, সামগ্রিকভাবে দেশের মোট আমদানির ৩৫ শতাংশ চীন থেকে। গত ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের মোট বাণিজ্য প্রায় ১৪ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে আমদানি বাণিজ্যের পরিমান ১৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং রফতানি বাণিজ্যের পরিমান ৮৩১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থাৎ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের মতো।

আসন্ন সমস্যা সমাধানে, পণ্য আমদানির বিকল্প উৎস জরুরি ভিত্তিতে খুঁজে বের করা এবং বিকল্প সূত্র থেকে পণ্য আমদানির পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়েছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। একি সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে সমন্বয় বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রলণালয়ে একটি মনিটরিং সেল গঠন করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

মতামত দেয়া সংগঠনগুলোর মধ্যে একটি ব্যবসায়ী সংগঠন দাবি করেছে, চীনের সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বর্তমান সরকারের চলমান ১ লাখ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যার ফলে এসব প্রকল্পের সময় ও ব্যয় দুটোই বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে দেশের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ পড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে। চীন থেকে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও ইকুইপমেন্ট আসতে না থাকলে অবকাঠামো উন্নয়নের এসব প্রকল্পের কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। ফলে কর্ণফুলী টানেলসহ অনেক মেগা প্রকল্প সম্পন্ন করতে দেরি হওয়ার কারণে প্রকল্প ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি পাবে।

জানা গেছে, চীন ও পার্শ্ববর্তী দেশে থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে সে তথ্য চেয়ে এফবসিসিআইকে ৩ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নিদের্শনা দিয়েছিলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ৬ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্য সচিবের নেতৃত্বে ব্যবসায়ীদের সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে না পারলেও ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৫টি ব্যবসায়ীক সংগঠন তাদের মতামত জানিয়েছে। প্রাসঙ্গিক বিষয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনও করেছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। ইতিমধ্যে প্রতিবেদনটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে সংগঠনটি।

ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলো জানিয়েছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৫৬ বিলিয়ন ডলারের আমদানির প্রায় ২৮ শতাংশ চীন থেকে সম্পন্ন হয়েছে। এর ৭০ শতাংশ টেক্সটাইল শিল্পের কাঁচামাল, মেশিনারি, বয়লার, ইলেক্ট্রিক্যাল এবং মেকানিক্যাল যন্ত্রপাতি। চলতি অর্থবছরে করোনাভাইরাসের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হলে পর্যাপ্ত কাঁচামাল সরবরাহের অভাব দেখা দেবে। যার ফলে শিল্পোৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

তারা দাবি করছে, নতুন এই সংক্রমক ব্যাধির কারণে দেশে আমদানির পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। আলোচিত সময়ে এলসি খোলার হার প্রায় ৩৭ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ চীন থেকে পণ্য আমদানির পরিমাণ লক্ষ্যণীয়ভাবে হ্রাস পাচ্ছে। নতুন এলসি খোলার হার কমায় আগামীতে এই আমদানির পরিমাণ আরো অনেক কমে যাবে। ফলে ব্যাংকের মুনাফাতেও ঘাটতি দেখা দিবে।

অন্যদিকে, আমদানি হ্রাস পাওয়ার প্রভাবে অভ্যন্তরীণ বাজারে অনেক পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন কেমিক্যাল, রং ইত্যাদি শিল্পে স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসাথে আদা, রসুন, পেঁয়াজ ইত্যাদি ভোগ্যপণ্যের দামও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব দ্রব্যমূল্য এখনো সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও অদূর ভবিষ্যতে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে দাবি করছে ব্যবসায়ীরা।

করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশের সেবাখাতেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এর ফলে চীনে পর্যটক গমনাগমনের পরিমাণ বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। লজিস্টিকস খাতে ইতোমধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এছাড়া মোবাইল, কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশ আমদানি না হওয়ার কারণে এসব সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও সমস্যা সৃষ্টি হবে।

তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো তাদের মতামতে উল্লেখ করেছেন, চীন থেকে যেসব পণ্য আমদানি করা হয় তার বিকল্প উৎস জরুরি ভিত্তিতে খুঁজে বের করতে হবে। এসব বিকল্প সূত্র থেকে এলসি খোলার মাধ্যমে পণ্য আমদানিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে সমন্বয় বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রলণালয়ে একটি মনিটরিং সেল গঠন করাও প্রয়োজন।

এছাড়া দেশের বাহিরের মিশনগুলোতে আউট সোর্সিং সেল খুলে স্বল্প ও দীর্ঘকালীন যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের বিকল্প উৎস খুঁজে বের করে আগামী দিনে যাতে আর কখনো ভোগান্তিতে পড়তে না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।

ads